ভালোবাসা কারে কয় // বাংলা গল্প // Bangla Golpo // Bengali Story // New Bengali Story //Notun Bangla Golpo//Premer Golpo ।

ভালোবাসা কারে কয়? 

রূপবালা সিংহ রায়


 সেদিন বাবার উপর খুব রাগ হয়েছিল অঙ্কনার। সেই সঙ্গে হয়েছিল খুব অভিমান ও। দুঃখে কষ্টে মনে হচ্ছিল এ জীবন না থাকলেই বোধ হয় ভালো হতো। নিজেকে শেষ করে দিতে পারলে নিস্তার পাওয়া যেত এসবের হাত থেকে। কিন্তু পায়নি সে নিস্তার। বাবার কথা মতো বসতে হয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে, বাবার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করার জন্য। বাধ্য হয়েছিল অন্য একজনের গলায় মালা পরাতে তা না হলে বাবার ফটোতে যে মালা ঝুলত। হঠাৎ করে ধেয়ে আসা সুনামির মত তার স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে গিয়েছিল চোখের নিমেষে। অবশিষ্ট ছিল চোখের জল আর ঋষির সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো। ভেঙে গিয়েও যেন কোথাও একটু অবশিষ্ট ছিল তার সঙ্গে সংসার গড়ার স্বপ্নগুলো, তারা যে মরে গেয়েও মরে না। বাবা কি করে পারলো এমনটা করতে তার সঙ্গে, আজও তা মাথায় ঢোকে না তার। তাই তেমন একটা আর সে যেতে চায়না সেবাড়িতে। দুঃখে কষ্টে অভিমানে গুমরে গুমরে মরে প্রতিটা মুহূর্ত। আজ ছয় মাস অতিক্রান্ত তার বিয়ে হয়েছে সবুজের সাথে। ছেলেটা মন্দ নয়। বেশ শান্ত প্রকৃতির। একজন স্বামীর মধ্যে যা যা গুণ থাকা উচিত সবই আছে তার মধ্যে, বেশি বই কম নয়। তবুও সে মন পায়নি অঙ্কনার। এখনো দূরত্বের এক অদৃশ্য দেয়াল বিদ্যমান তাদের মধ্যে। সবুজ যে তা একেবারে বোঝেনা তা নয় বুঝেও না বোঝার ভান করে অপেক্ষা করে আছে কখন অঙ্কনার মন পাখিটা নিজে থেকে এসে বসবে তার বুকের পিঞ্জরে। অপেক্ষা ছাড়া আর কিইবা করার আছে তার! মায়ের কাছে যখন বিয়ের সম্বন্ধখানা এসেছিল মা তখন অঙ্কনার একটা ছবি দিয়েছিল তাকে দেখতে। কাজল মাখা টানা টানা চোখ আর সুন্দর মুখশ্রীতে মুচকি হাসি নিয়ে একটা নীল রঙের শাড়ি পরে বসে আছে সে ছবিটাতে। এক দেখাতেই ভালো লেগে যায় তার। বরাবরের লাজুক স্বভাবের সবুজ এতক্ষণ কোনো মেয়ের দিকে কখনো একটানা তাকিয়ে থাকেনি, যতক্ষণ সে তাকিয়ে ছিল অঙ্কনার ছবিটার দিকে। তাই বিয়েতে না করার কোন প্রশ্নই ছিল না তার তরফ থেকে। বিয়ের আগে গিয়েওছিল সে অঙ্কনাদের বাড়িতে। কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। তেমন কিছু বুঝতে পারেনি সে তখন কিন্তু এখন সে বোঝে সেদিন কম কথা বলছিল কেন অঙ্কনা? কেন সেদিন সে শুধু হ্যাঁ আর না'তে সীমাবদ্ধ ছিল। আজ বড় আফসোস হয় তার। কেন সেদিন আমি বুঝতে পারলাম না ওর মনের কথা? বড্ড অপরাধবোধে ভোগে সে এখন। তবুও কিছু করার নেই তার তাই সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছে সবকিছু। সে সময় যে আর আসতেই চায়না সবুজের জীবনে। আসি আসি করে প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত। একই ছাদের নিচে দুজন মানুষ বর বউ খেলায় মত্ত। তাদের অভিনয় দেখে কেউ ধরতেই পারবে না তারা এত কাছে থেকেও কত শত মাইল দূরে। রবিবার দুপুর রান্নাবান্না শেষ শাশুড়ি মা খাবার জোগাড় করছেন। সবুজ ইতিমধ্যে বসে পড়েছে খাবার টেবিলে। অঙ্কিতা গেল শ্বশুর মশাইকে ডাকতে তাঁর ঘরে। এই তাঁর এক দোষ সারাদিন টিভিতে খবর চালিয়ে বসে থাকেন। মানুষ খবরের যে কি দেখে বুঝে পান না তার শাশুড়ি মা। মাঝেমধ্যে ঝগড়াও লেগে যায় তাঁদের মধ্যে এই নিয়ে। অঙ্কনা যেতে যেতে শুনতে পাচ্ছে খবরের আওয়াজ। বেশ একটু বিরক্তই হলো সে। এই নিয়ে দু দুবার ডাকতে এলো তাঁকে। কিন্তু যাচ্ছি যাচ্ছি বলেও যাওয়ার নাম নেই তাঁর। এবার আর ডাকবো না টিভিটা বন্ধ করে দেব তারপর যা হওয়ার হবে - ভেবে রিমোটটা নিয়ে টিভিটা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় টিভির স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ঋষির ছবি। পুলিশ তাকে এ্যারেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে। রিপোর্টার জানাচ্ছেন সে নাকি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দু তিনজন মেয়ের সর্বনাশ করেছে কিন্তু পরে আর বিয়ে করেনি। তারা কিছু না বলেও এবারের মেয়েটা মুখ খুলেছে। জানিয়েছে সে পুলিশকে সেসব। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে অঙ্কনার। যে মানুষটাকে সে মনে প্রানে ভালোবাসতো এমনকি যার কথা ভেবে এখনো সে অতীতেই পড়ে আছে তার স্বভাব কিনা এরকম! ছিঃ!ভাবতেই গা টা কেমন যেন গুলিয়ে ওঠে তার। মনে পড়ে সেবার কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটা পার্কে সে দেখা করতে গিয়েছিল তার সাথে। সে তখন চেয়েছিল গায়ে হাত দিতে। কিন্তু পারেনি আপত্তি জানিয়েছিল অঙ্কনা। বলেছিল যা হওয়ার বিয়ের পরে হবে। খুব রেগে গিয়েছিল ঋষি। তারপর অবশ্য সব ঠিক হয়ে যায়। সে দিক থেকে দেখতে গেলে সবুজ কত ভালো, বিয়ের এত দিন পরেও ভুল করেও সে তার সম্মানে হাত দেয়নি। খুব রাগ হয় তার নিজের উপর। সবুজের কথা ভেবে মনে মনে আশঙ্কাও হয়, ও কি আমায় মেনে নেবে ? কান্না পায় বাবার কথা ভেবে। সেদিন না জেনে বুঝে কত কথাই না শুনিয়েছিলাম তাকে। বাবা বারবার বলেছিল ঋষির চরিত্রের কথা। সেদিন বিশ্বাস হয়নি তার আজ সে বুঝতে পারছে। সম্বিত ফেরে শ্বশুরমশাইয়ের কথায় - কি হলো বৌমা, তোমারও কি আমার ছোঁয়া লাগলো নাকি? তাড়াতাড়ি চলো দেরী হয়ে গেলে আর রক্ষে থাকবে না। তড়িঘড়ি বন্ধ করে দেয় সে টিভিটা। তারপর ধীরে ধীরে গিয়ে বসে খাবার টেবিলে। কোনো রকমে দুটো খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে পর্দাটা টানতে যাবে এমন সময় সামনে উপস্থিত সবুজ। তাকে দেখে একটু ইতস্তত বোধ করে সে। মনে মনে রাগও হয়। কি দরকার ছিল ওর এখন ঘরে আসার? অন্যান্য রবিবারের মতো ক্যানভাস আর রং তুলি নিয়ে বসে পড়তে পারতো তো ড্রয়িং রুমে! কোথায় ভাবলাম একটু একান্তে থাকবো মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে তা নয় এসে হাজির। অঙ্কনাকে কোনো কথা বলতে না দেখে সবুজ বলল -- কি হয়েছে বলোতো তোমার? -- কি আর হবে? -- না না কিছু তো একটা হয়েছে। বাবাকে ডাকতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তো ঠিক ছিলে। তারপর থেকে কেমন যেন থ মেরে আছো। চোখ দুটো ছলছল করছে। বাবা কি কিছু বলেছে? নাকি মা? নাকি আমি কোনো ভুল করলাম? আর চুপ থাকতে পারলো না অঙ্কনা। কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।সবুজ অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করল -- কি হয়েছে বলবে তো? কাঁদছো কেন? ভালো লাগে না তোমায় এমন দেখতে। বলবে তো, কি হলো? আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না অঙ্কনা সবুজের বুকে মুখ গুঁজে বলল -- ভুল তোমার নয় আমার। মানুষ চিনতে ভুল করি আমি! তাই তো ভুল করে ভুল লোককে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিলাম। বুঝিনি, ভালোবাসা কাকে বলে? মুচকি হেসে সবুজ তাকে জড়িয়ে ধরে বলে -- এখন বুঝতে পারেছ তো, ভালোবাসা কারে কয়? -- হু বলে ঘাড় নাড়লো অঙ্কনা। -- তাহলেই হবে বলে বাহুডোর আরো শক্ত করে দেয় সবুজ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।