অভিমান - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // বাংলা ছোট গল্প // Bangla Golpo //Bengali short story।
অভিমান
রূপবালা সিংহ রায়
রোদ ঝলমলে মিষ্টি একটা সকাল। মাঝেমধ্যে জানালা দিয়ে আসছে মৃদুমন্দ শীতল বাতাস। গতকালের তুলনায় গরমটা আজ একটু কমই আছে। কদিন যা গরম পড়ছে কে বলবে এটা বসন্তকাল! ঘেমে নিয়ে একাকার হবার যোগাড়। যেন মনে হচ্ছিল গ্রীষ্মের কাঠফাটা কোনো এক দুপুর। আজকের এই মনোরম পরিবেশ আর সেইসঙ্গে দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছটা থেকে ভেসে আসা কোকিলের মধুর কুহুতান মনটাকে ফুরফুরে করে দিয়ে গেল বিতানের। তার ওপর সোনায় সোহাগা হল অফিস নেই আজ। সারাদিন বাড়ি থাকা যাবে। আরামের সঙ্গে সঙ্গে একটু সময়ও কাটানো যাবে শুভ্রার সাথে। কিন্তু তার তো পাত্তাই নেই তাহলে কি আমায় একা ফেলে চলে গেল মর্নিং ওয়াকে? পুরো বাড়িটা কেমন যেন নিস্তব্ধ। বাড়িতে থাকলে তার আওয়াজ তো পাওয়া যেত। ভাবনার ফাঁকে একবার তাকিয়ে নেয় সে ঘড়ির দিকে। বেলা তখন আটটা। নিশ্চয়ই একা একা চলে গেছে। সেদিন বললাম-- ভাবছি এবার থেকে একটু শরীর চর্চা করব। জিমে গেলে কেমন হয়? ও বলেছিল -- অত জিমে গিয়ে টাকা খরচ করে লাভ নেই। তার থেকে বরং আমার সঙ্গে মর্নিং ওয়াকে চলো। শরীর চর্চা হবে পাশাপাশি মনটাও ভালো থাকবে। আর সেই সঙ্গে আমাকেও সময় দেওয়া হয়ে যাবে। সত্যি আজকাল আর সময় দেওয়া হয় না ওকে। সেই জন্য ওকে বলেছিলাম পঁই পঁই করে-- সকালে যেন ডেকে দেয়। আর কি করল? একা একা চলে গেল! বেশ তাই হোক। এবার থেকে তাহলে আমিও যাব জিমে। এমন সময় রান্নাঘর থেকে প্রেসার কুকারে সিটি পড়ার আওয়াজ এলো তার কানে। গেল সেখানে দেখল শুভ্রা ব্যস্ত রান্না ঘরে। এত সকাল সকাল রান্না বসিয়েছে, তাহলে যায়নি ওয়াকে। নিশ্চয়ই আমায় ডেকেছিল, আমি উঠিনি বলে ও..ও যেতে পারেনি। আর বেকার বেকার রাগ করলাম ওর ওপর। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঢুকলো রান্না ঘরে।
রান্নাঘরে পা রাখতেই বুঝলো বাইরের পরিবেশটা যতটা না সুন্দর আর মনোরম ঘরেরটা ঠিক তার দশ গুণ বিপরীত। এক ঝটকায় তার সমস্ত সিদ্ধান্ত বদলে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগলো অফিস থাকলেই ভালো হতো। অফিস থেকে যে আজ কোন দুঃখে ছুটি নিয়েছিলাম কে জানে? গতকাল শুক্রবার দোলের জন্য ছুটি ছিল। তারপর ভাবলাম মাঝে শনিবারটা ছুটি করলে পরের দিন রবিবার তাহলে পরপর তিনদিন ছুটি পাওয়া যাবে। এ তো দেখছি নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারার মত অবস্থা। কোনো উপায় না দেখে এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘময় মুখমন্ডলে এক হালি হাসি আনার জন্য সকল রকমের চেষ্টা করতে শুরু করল সে। তাই তাড়াতাড়ি করে গিয়ে নিজেই বসিয়ে দিল চায়ের জলটা। তাকে চা বসাতে দেখে কোনো হেলদোল নেই শুভ্রার। অথচ অন্যদিন এমনটা করলে সে বারণ করে বলে -- না করবে না। একদিন বাড়ি থাকো তাতেও ঘরের কাজ করবে! কিছু বলতে গেলে সে বলে-- আমি যখন পারব না তখন করো। আর কোনো কথা না বলে বিতান মুচকি হেসে জো হুকুম মহারানী বলে গিয়ে বসে সোফাতে।
নির্ঘাত কিছু তো ভুল হয়েছে তা না হলে এমন গুমড়ে আছে কেন? এর থেকে প্রবল এক ফসলা ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার মতো ঝগড়া করে নিলে তো মিটে যায়। এমন থমথমে আবহাওয়া যে একেবারে ঠিক নয় তার জন্য তা সে ভালো করেই জানে। তাই নিজেই শুরু করলো কথা বলা -- ওয়াকে গেলে কই আমায় ডাকলে না তো? কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে সে আবারও বলল-- আমি কি কোনো অন্যায় করে ফেলেছি ম্যাডাম?
-- কেন ঘ্যান ঘ্যান করছ বলতো? যাও এখান থেকে। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না আমার।
-- কেন বলতে ইচ্ছা করছে না সেটাই তো জানতে চাইছি। গতকাল তো বেশ ভালোই ছিলে। কি সুন্দর গেলাম আমরা দোল খেলতে। আজ আবার হঠাৎ কি হল?
-- অত জেনে কি লাভ তোমার?
-- আরে বাঃ! একমাত্র বউ বলে কথা, জানবো না ...
-- ও আরো বিয়ে করার শখ বুঝি। তা যাও না, কে বারণ করেছে তোমায়? চলে যাব আমি, থাকবো না তোমার সাথে।
-- আরে! ভারি জ্বালাতো, আমি কি সে কথা বললাম? এই জন্যই বলি দোষ আমার। থাকতে তুমি তোমার মতো, আমি আমার মতো তাহলেই ঠিক হতো।
-- তা তো হবেই। আমি আমার মতো থাকলেই তো তোমার সুবিধা..
-- এই বাজে কথা বলবে না একেবারে। কিসের সুবিধা শুনি?
-- অতো শুনে কাজ নেই। থাকো গিয়ে তুমি তোমার মতো আর আমি আমার মতো...
রাগ করে রান্নাঘর থেকে বের হতে গিয়েও বের হতে পারল না বিতান। ঝড় বয়ে গেছে অল্পের উপর থেকে। এরপর শুরু হবে বর্ষণ। এই স্বল্প বর্ষণে না ভিজলে পরে তা যে অন্য রূপ নেবে না তারও ঠিক নেই। তাছাড়া বেকার বেকার দিনটা খারাপ করেও লাভ নেই, ভেবে নিজেকে শান্ত করে গেল তার কাছে। যা আন্দাজ করেছিল তাই.. ঠিক। তাকে ফেরত আসতে লুকিয়ে চোখ দুটো মুছে নিল শুভ্রা। তা দেখে নরম গলায় বিতান বলল -- বলো না কি হয়েছে তোমার? কেন এমন করছ? ভালো লাগে বলো ঝগড়াঝাটি। আর তাছাড়া কি হয়েছে না বললে বুঝবো কি করে? এমন তো কথা হয়নি আমাদের। মনে নেই কি কথা হয়েছিল বিয়ের আগে? ওই যে সেদিন যেদিন আমাদের বিয়ের পাকা কথা হয় বলেছিলাম না কিছু হলে সেটা মনের মধ্যে পুষে না রেখে বলবে আমায়। তুমিও তো কথা দিয়েছিলে। তবে আজ কেন এমন করছ? মাস ছয়েকের মধ্যে সে কথা ভোলার মেয়ে তো তুমি নও।
তার কথায় কিছুটা শান্ত হয়ে ছল ছল চোখে অভিমানী মুখ নিয়ে নিজের ফোনটা এনে একটা ভিডিও চালিয়ে সেটা ধরিয়ে দিল তার হাতে। ভিডিওটাতে একটা মেয়ে পরপর দু তিন মুঠো আবির নিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছে বিতানের মুখ মাথা গাল। বুঝতে অসুবিধা হলো না তার অভিমানের কারণ। তারপর ফোনটা রেখে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে সে বলল -- ও এই জন্য তুমি রাগ করে বসে আছো! সে যদি আমায় রং মাখায় তো আমি কি করবো?
-- তুমিও তো তাকে মাখালে...
-- সেটা কি উচিত নয়?
-- আমি সে কথা বলিনি
-- তো?
-- আচ্ছা আমি যখন তোমায় রং মাখাচ্ছিলাম তুমি অল্প দেবে অল্প দেবে বলে চেঁচাচ্ছিলে। আর মেয়েটা যখন দিল তাকে কিছু না বলে উল্টে কেমন হেসে হেসে তাকেও মাখাচ্ছিলে রং। মনে মনে ভাবলো বিতান তাইতো কেন যে অমন করতে গেলাম ওর বেলা কে জানে? আর মেয়েটার বেলাতেও কেনইবা হাসছিলাম কিছুই তো মাথায় আসছে না! কি যে করবে দিশেহারা সে? কিছু ভেবে না পেয়ে বলল -- কথা দিচ্ছি তোমায় পরেরবার আর হবে না। হোলির দিন বাইরেই বের হবো না। তুমি যত পারো রং মাখিও আমায়। আর বিশ্বাস করো চিনি না আমি মেয়েটাকে। কোথা থেকে যে এল কে জানে? কান মলছি, আর যাব না হোলি খেলতে। এবার তো রাগ কমাও।
তার কথা শুনেও না শোনার ভান করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল শুভ্রা। ওদিকে তার অভিমান ভাঙানোর উপায় খুঁজতে ব্যস্ত বিতান...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন