Bengali Story//Bangla Golpo//বাংলা গল্প //গল্প//বাংলা ছোট গল্প// Bengali Short Story ।
খুব খুশি ছিল সেদিন মামন। খুশি ছিল তার বাবা আর ঠাম্মামও। খুব সুন্দর করে বেলুন দিয়ে সাজিয়েছিল ঠাম্মাম পুরো বাড়িটাকে। ভাই আসবে যে, তার জন্য। বাবা গতকাল রাতে মাকে নিয়ে গেছে হাসপাতালে। খেতে খেতে হঠাৎ করে মা চিৎকার করে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। খুব ভয় পেয়ে যায় মামন। বাবা তড়িঘড়ি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে মাকে নিয়ে চলে যায়। মামনকে ছল ছল চোখ নিয়ে দুশ্চিন্তায় জড়সড় হয়ে বসে থাকতে দেখে ঠাম্মাম বলে -- ধুর পাগলী, এতে এত ভয় পাওয়ার কি আছে? দু-একদিনের মধ্যেই মা বাড়ি ফিরে আসবে ভাইকে নিয়ে।
-- ভাইকে নিয়ে আসবে! সত্যি বলছো ঠাম্মাম! আনন্দে জড়িয়ে ধরে সে তার ঠাকুমাকে।
বয়স বারোর কাছাকাছি, তাই আগে থেকেই জানতো সবকিছু। মনের মধ্যে এক আলাদা আনন্দ কাজ করছিল এই আট মাস ধরে তার। সবকিছু পরিকল্পনাও করে রেখেছিল। ভাই আসলে ওকে কোলে নেবে, স্নান করাবে, খাওয়াবে, ওর সাথে খেলা করবে, বেড়াতে যাবে। ও একটু বড় হলে পড়াবে আবার একসাথে স্কুলেও যাবে। দিনরাত চোখের সামনে কেবল ভাসতো এসব।
পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ ঠাম্মামকে বাবার সঙ্গে কথা বলতে দেখে সে কেমন যেন বুঝতে পারছিল কিছু একটা গন্ডগোল তো হয়েছে। ঠাম্মামের হাসি মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। একটু পরে বাবাও ফিরে এসেছে শুকনো মুখ নিয়ে। মামন বরাবরের মতো এক গ্লাস জল নিয়ে তার কাছে গেলে ঢক ঢক করে তা পান করে বাবা চলে যায় তার নিজের ঘরে। আদর করা তো দূরের কথা একটু হাসলো পর্যন্ত না তাকে দেখে। খুব রাগ হলো মামনের। কি হয়েছে ভাই হয়নি তো! বোনু তো হয়েছে। এতে এত রাগ করার কি আছে?
তিন চার দিন পর মা বোনকে নিয়ে ফিরে এলো বাড়িতে। মামন খুশি হলেও খুশি নয় মা, বাবা, ঠাম্মাম কেউই। একদিন দুপুরে ঠাম্মাম ঘুমিয়ে পড়লে মামন চুপিচুপি গিয়ে জিজ্ঞাসা করে তার মাকে -- মাম্মাম তুমি খুশি নও বোনুকে নিয়ে। মা তাকে জড়িয়ে ধরে ফ্যালফ্যাল করে কান্না করে দিয়েছিল। মায়ের চোখ দুটো মুছিয়ে মামন বলেছিল -- কি হল মাম্মাম তুমি কাঁদছো কেন? ভাই হয়নি তো কি হয়েছে! বনু তো ভালো।
মা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলেছিল -- আমি খুশি হলে কি হবে তোর বাবা ও ঠাম্মামতো খুশি নয়।
-- বাদ দাও তো ওদের কথা বলে মায়ের কান্না থামালেও ছোট্ট মাথায় তখন ঢোকেনি মা কেন খুশি নয়। সেটা সে বুঝেছিল সেদিন যেদিন মা বোনকে নিয়ে বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তার আর ঠাম্মামের ঘরের মেঝেতে বিছানা বিছিয়ে শুয়েছিল। মা কেন খুশি নয় বুঝেছিল মায়ের ওপর ঠাম্মামের ব্যবহার দেখে, ঠাম্মামের কথা শুনে। মা কিচ্ছু বলেনি আর বলতোও না, শুধু চোখ থেকে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়তো দু ফোঁটা চোখের জল।
এমনি করে বোনুর এখন ছ মাস। তার ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে। বেশ সময় কাটছে তার বোনুর সঙ্গে। ইতিমধ্যে রেজাল্ট বেরিয়ে পড়ল। সেদিন রাতে মা বাবাকে মার্কশিট টা দেখাতে গেলে লেগে যায় তুমুল ঝগড়া। বাবার কথা এলো তার কানে - পারবো না আমি তোমার মেয়েদের বোঝা টানতে। কি হবে ওদের দামি স্কুলে পড়িয়ে? সেই তো পরের বাড়ি যাবে... পারলে না তো একটা ছেলের জন্ম দিতে... আরো কত কি?
বাবার কথা শুনে খুব কান্না পায় মামনেরও। পরদিন একান্তে মাকে বলে-- চলো মা আমরা চলে যাই।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল -- কোথায় যাবি?
-- চলো না অন্য কোথাও গিয়ে থাকবো...
-- কি খাব? কিভাবে মানুষ করব তোদের? তাছাড়া বোনু তো ছোটো ওকে একা রেখে কিভাবে যাব কাজে? এসব মাথায় নিস না মা, কদিন পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কদিন যেতে হয়নি মা নিজেই বুঝতে পারে এ ঠিক হওয়ার নয়, তাই একটা কাজ জোগাড় করে বেরিয়ে আসে ও বাড়ি থেকে। তারপর শুরু হয় তাদের লড়াই। বেঁচে থাকার লড়াই। মেয়ে বলে ফেলনা নই সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার লড়াই, প্রমাণ করার লড়াই। বুদ্ধি করে সে ভর্তি হয় মর্নিং স্কুলে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দশটা এগারোটা। তারপর সে সামলায় বোনুকে। আর মা এক বুক ভরা অনিশ্চয়তা নিয়ে দুই মেয়েকে একলা ভাড়া বাড়িতে ফেলে বের হয় কাজে।
এখন মামন কলেজে পড়ে। সেই সঙ্গে মাকে সাহায্য করার জন্য টিউশনিও করে। বনু স্কুলে যায়। ইতিমধ্যে মা-বাবার ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাবা আবার বিয়ে করেছে। বাবার স্বপ্ন সফল হয়েছে। এবার একটা ছেলে হয়েছে। সেদিন তার দেখা হয়েছিল বাবার সঙ্গে। বাবার সঙ্গে ভাইও ছিল। চিনতে ভুল হয়নি মামনের বাবাকে। সেই বাবা যার কোলে পিঠে চড়ে কাটিয়েছিল বারোটা বছর। দূর থেকে দেখতে পেয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গিয়েও যেতে পারল না সে। সোজা গিয়ে ধমকে ছিল ভাইকে। ভাই মনে হয় একটা মোবাইল ফোনের জন্য বাবার কাছে বায়না করছিল। বাবা না করায় সে বাবাকে বলছিল -- তুমি কেমন বাবা যে একটা মোবাইল কিনে দিতে পারো না? তুমি জানো আমার স্কুলের সব বন্ধুদের মোবাইল আছে এক আমি ছাড়া! কেন হতে গেলে বলতো আমার বাবা? আমার কপালটাই খারাপ যে তোমার মত বাবা পেয়েছি... আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল আচমকা মামনের রক্তচক্ষু দেখে থেমে গিয়ে সে মামনকে বলল -- কে তুমি? রাগ দেখাচ্ছ কেন?
-- তো কি করব বল তোকে? ইচ্ছা করছে, এক মেরে তোর দাঁতগুলো সব ফেলে দিই। বাবার সাথে এভাবে কেউ কথা বলে?
-- বলেছি বেশ করেছি। আমার বাবা আমি যা খুশি তাই বলতে পারি। তোমার অতো গায়ে লাগছে কেন? তোমার বাবাকে তো বলিনি।
কথাটা শুনে নিজেকে সামলাতে পারেনি মামন। মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল -- উনি তোর একার বাবা নয়, আমারও বাবা। তাই নেক্সট টাইম বাবাকে একটাও খারাপ কথা বললে মার খাবি আমার কাছে।
নিজের কথা নিজের কানে আসতেই পরমুহূর্তে নিজের ওপর নিজেরই খুব রাগ হলো তার। উত্তেজনার বসে বাবাকে বাবা বলেই ফেললাম। অথচ যে মানুষটা আমার আর বোনুর বাবা হওয়ার যোগ্যই নয়! ঠিক করেছে ভাই। তুমি না ছেলে চেয়েছিলে বাবা? এটাই তোমার প্রাপ্য -- ভাবতে ভাবতে বাবার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করে সে...
#মেয়ে_বলে_ফেলনা_নই
#রূপবালা_সিংহ_রায়...🖋️©️
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন