স্যান্টার উপহার - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।

 

স্যান্টার উপহার 

রূপবালা সিংহ রায় 

Santar Upohar written by Rupbala Singha Roy // Bengali Story //  Bangla Golpo // New Bengali Story // Borodiner Golpo.

ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে পাশ ফিরতে গিয়ে চমকে ওঠে আরতি দেবী। তাহলে কি সত্যিই আছে স্যান্টাক্লজ। আর যদি নাই থাকবে তবে রঙিন কাগজে মোড়া বক্সটা এখানে এলো কিভাবে! দেখব খুলে? না না থাক, সকালে সবাই উঠলে সবার সামনে খুলবো। উফ! কি মজাটাইনা হচ্ছে। তিতলি দিদিভাইকে দেখাবো সান্টা আমাকেও উপহার দিয়েছে। আরো মজা হচ্ছে এই ভেবে যে তার মনের ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে। কত দিনের পুরনো শখ তার। ধুর! আর যেন ঘুমই আসছে না। এপাশ-ওপাশ করতে করতে পুবের কোণে আলো ফুটে উঠেছে। প্রত্যেক দিনের মত উঠে ঠাকুর প্রণাম করে গেল রান্নাঘরে। গত একমাস ধরে এটাই তার রুটিন। এর আগে সে যখন গ্রামের বাড়ি থাকতো তার স্বামীর সঙ্গে তখন সকাল-সকাল স্নান পুজো সেরে তবেই ঢুকতো রান্নাঘরে কিন্তু এখন সে থাকে ছেলের সাথে। ছেলের কড়া নির্দেশ অত ভোর ভোর স্নান করা যাবে না। আর বলবেই না বা কেন, নিউমোনিয়া ধরে নিল যে। বয়সটাও যে বেড়েছে, তাই এখন আর অত ধকল নিতে পারে না। তারপর মাস দুইয়েক আগে বাবাকে সারা জীবনের মতো হারিয়ে, ছেলে যেন তার প্রতি আরো যত্নশীল হয়ে উঠেছে। তাই তো যখন সে বলল প্রয়াগে যাওয়ার কথা সেখানে মাঘী মেলা উপলক্ষ্যে,ছেলে না..ই করে দিল। বলল -- ছাড়া যাবেনা তোমায় একা একা। বলেছিল সে একা আর কোথায় যাচ্ছি গ্রামের অনেকেই তো যাচ্ছে। কটা দিনেরই তো ব্যাপার, প্রয়াগরাজ হয়ে অযোধ্যার রাম মন্দির আর কাশী বিশ্বনাথ ঘুরেই ফিরে আসব। এমন সুযোগ কি বার বার আসে? কিন্তু ছেলের সেই এক গোঁ। এই ছেলেটাও হয়েছে ঠিক তার বাবার মতো। না কোথাও নিয়ে যাবে, না যেতে দেবে! সারা জীবন শুধু সংসার আকড়েই গেল সে। তাছাড়া আজকাল মনটা বড় খারাপ তার। সারা জীবনের সঙ্গীটা ছেড়ে গেল যে। ছেলে বৌমার সাথে কি আর সেসব দুঃখের কথা বলা যায়। তারা যে সমবয়সী নয়, তারা বুঝবে কি করে? তাছাড়া তারও তো বয়স কম হলো না। এখন তীর্থ করবে তো কখন করবে? তার দূর সম্পর্কের বড়ো জা ও তো যাচ্ছে। যাচ্ছে পাশের বাড়ির বিপিনের মা, মুখুজ্যে বাড়ির মেজ বউ, সতীশের মা আরো অনেকে। যাবার টাকাও যে নেই তা তো নয়, শুধু যাবার অনুমতি টুকু নেই! তাই যখন তিতলির মুখে শুনল ক্রিসমাসের সময় নাকি লাল টুপি পরে সান্টা বুড়ো আসে আর সবার মনের ইচ্ছা পূরণ করে তখন ঠাকুর ঘরে গিয়ে নিজের মনের কথাটা বলেছিল সে সান্টাকে। সত্যি সত্যি যে সান্টা আসবে ভাবতে পারেনি। কিন্তু কি হতে পারে বাক্সটাকে ভাবতেই বৌমাকে তরকারিটা দেখতে বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে চুপি চুপি গিয়ে বলল কথাটা তিতলিকে। তা শুনে উচ্ছ্বাসিত তিতলি দৌড়ে গিয়ে বক্সটা নিয়ে এসে রাখল তার বাবার সামনে। তারপর একটু দম নিয়ে বলল -- দেখো বাবা ঠাম কে ও স্যান্টা গিফ্ট দিয়ে গেছে। দাঁড়াও দেখি কি গিফ্ট দিল বলে কারো অনুমতির অপেক্ষা না রেখেই তা খুলে তার মধ্যে থেকে বের করল একটা চিরকুট । তাতে লেখা আছে- নিজের খেয়াল রাখতে পারলেই যেতে পারবে। তিতলির ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় লেখাটা পড়া শুনে আনন্দে চেঁচিয়ে বলল আরতি --পারবো সান্টা পারবো। 


ব্যাপারটা বুঝতে বাকি রইল না তার ছেলে নীহারের। স্ত্রী অনুর হাতটা ধরে নিয়ে গেল ঘরের মধ্যে তারপর বলল --তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? জানো ওখানে এখন কত ঠান্ডা! তুমি কি চাও বলো তো? মা ও বাবার মতো চলে যাক!

 চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে অনুর। ভাঙ্গা গলায় বলে -- মায়ের খুব ইচ্ছা যাবার। জানি ওখানে খুব ঠান্ডা কিন্তু ভগবান না করুন মায়ের যদি এখন কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে তার ইচ্ছাটা কি অপূর্ণ থেকে যাবে না? 


--অনু তাই বলে মাকে তো আর একা একা ছাড়া যায় না।তুমি জানো না মা কোথাও একা একা যায়নি ।


--একা কোথায় যাচ্ছে তোমাদের গ্রামের অনেকেই তো যাবে। আর তাছাড়া আমার মা-বাপিও যাবে। তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। আর তুমি ভুলে যেও না আমার বাপি একজন ডাক্তার। তোমার মায়ের কিছু হবে না।


অনিচ্ছা সত্বেও তাদের কথাগুলো কানে যায় আরতির। আস্তে করে গিয়ে ঢোকে ছেলে বউয়ের ঘরে। তারপর ছেলের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলে আমায় ছুঁয়ে কথা দে-- আর কখনো ভুলেও খারাপ কথা বলবি না বৌমাকে...


-- হুঁ বলে সে সরি বলে অনুকে।






মন্তব্যসমূহ