বড়দিনের কেক - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
বড়দিনের কেক
রূপবালা সিংহ রায়
আজ ২৫ শে ডিসেম্বর। তাই রং বেরঙের আলো ছটায় সেজে উঠেছে শহর কলকাতা। চারিদিকে চোখে পড়ছে বড়দিনের সাজ সজ্জা , সান্টাক্লজ, ক্রিসমাস ট্রি, নানা রঙের বেলুন আরো কত্ত কি! আলোর ঝলকানিতে চোখ যেন ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। আনন্দে মেতেছে শহরবাসী, বাচ্চা থেকে বড় কেউই বাদ যাচ্ছে না। রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে জীবন্ত সান্টাও। জাতপাত, ধর্ম ভুলে ধনী-গরীব নির্বিশেষে নিজেদের সাধ্যমত মেতে উঠেছে সবাই বড়দিনের উৎসবে। সল্টলেকের একটা নামকরা আবাসনে থাকে রিম্পি। পরিবার বলতে আছে মা-বাবা আর তার দিদিয়া তিয়াসা। দুই বোনের মধ্যে আকাশ মাতাল পার্থক্য। রিম্পি এখনকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাই স্ট্যাটাস সম্পন্ন জীবন যাপন করে। মাঝেমধ্যে ড্রিঙ্কস করে, সিগারেট খায়, বন্ধুদের সঙ্গে লংড্রাইভে যায়, লেট নাইট পার্টি করে। অপর দিকে তিয়াসা আবার অন্যরকম। সে ব্যস্ত তার পড়াশুনো নিয়ে,ক্যারিয়ার নিয়ে। দুই বোনের মধ্যে স্বভাবের মিল না থাকলেও বড়দিনের দিন এলে দুই বোনের কাউকেও ঘরে পাওয়া যায় না। দুজনই সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে নিজের নিজের গাড়ি নিয়ে। ফেরে শেষ রাতে। বাবা মা ও ব্যস্ত থাকে নিজেদের পার্টি নিয়ে। ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। মর্ডান যুগের মেয়েরা একটু স্বাধীনতা তো দিতেই হয়!
অলিগলি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজ, পার্ক,ময়দান, হোটেল , রেস্তোরাঁ সব কিছুই ঝকমক করছে। তিয়াসা সকাল সকাল নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। মা বাবাও ব্যস্ত পার্টি নিয়ে। এদিকে সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতে চলল তবুও রিম্পি বসে আছে তার নিজের ঘরে। জ্বলছে না একটাও আলো। অন্ধকার ঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে হাঁটুর কাছে মাথা গুঁজে বসে আছে সে। মাঝে মাঝে কান দুটোকে জোরে চেপে ধরছে সে । তবুও পাশের রিসর্টে বাজতে থাকা ডিজের আওয়াজ কানে ঢুকে যাচ্ছে তার। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। জোরে চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে তার। ভেঙে ফেলে দিতে ইচ্ছা করছে সবকিছু। মুক্তি পেতে চাইছে গত বছরের ক্রিসমাসের স্মৃতিটাকে। সেদিনও ছিল আজকের মতো জন স্রোতে ভরা রাত। মনের মধ্যে ছিল অফুরন্ত আনন্দ। বেরিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুরেছিল তারা। সঙ্গী ছিল নতুন বয়ফ্রেন্ড ও কিছু বন্ধু। তারপর তারা গিয়েছিল একটা রিসর্টে। পাঁচজন বন্ধুরূপী নরপশু ছিঁড়ে খেয়েছিল তাকে। আর মেয়ে বন্ধু গুলো বসে বসে মজা নিচ্ছিল। অনেক চিৎকার করেছিল সেদিন সে। কেউ বাঁচাতে আসেনি। পরদিন চোখ খুলেছিল নার্সিংহোমে। সামনে দাঁড়িয়ে ছিল দিদিয়া। মডার্ন মেয়ে রিম্পি বেশ কিছুদিন পর ফিরে এসেছিল স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু আজকের হইহুল্লোড় যেন তার মোটেই সহ্য হচ্ছে না। এমন সময় তিয়াসা ঢুকলো তার ঘরে।
-- কিরে বের হোস নি তুই?
--না রে দিদিয়া। ভালো লাগছে না
--চল আমার সাথে..
--নারে দিদিয়া তুই যা। আমি যাব না
রিম্পির মুখে এই কথা শুনে তিয়াসা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বসালো গাড়িতে। দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে গাড়ি শহরে থেকে বাইরে। গাড়ির জানালা দিয়ে ঢুকছে ঠান্ডা হিমেল বাতাস।
জিজ্ঞাসা করল রিম্পি --কোথায় যাচ্ছি দিদিয়া?
--চল গেলেই দেখতে পাবি।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এসে পৌঁছালো একটা জায়গায়। চারিদিকে অন্ধকার। গাড়ি থেকে নামলো তারা। দূরে টিমটিমে আলোতে একটা বৃদ্ধাশ্রমে সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে। তিয়াসা রিম্পির হাত ধরে নিয়ে চললো সেই দিকে। রিম্পি এক বুক জিজ্ঞাসা নিয়ে জিজ্ঞাসা করল -- এখানে কেন নিয়ে এলি রে দিদিয়া ?
--চল না মন ভালো হয়ে যাবে।
দুজন ঢুকলো একটা হল ঘরের মধ্যে। সেখানে বসে আছেন অনেক বৃদ্ধ বৃদ্ধা। তারা মাথায় পরে আছে লাল সাদা সান্টা টুপি। মুখগুলো খুশিতে চকচক করছে কিন্তু চোখগুলো যেন অন্য কথা বলছে। যেন খুঁজছে প্রিয়জনকে। যাদের জন্য নিজেদের জীবনের সব সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। নিজে না খেয়ে যে সন্তানদের মানুষ করেছেন তাদেরকে। তাদের ওপর শত রাগ অভিমান হওয়ার সত্তেও পুজোপার্বনের দিনগুলো তাদের সঙ্গে যেন কাটাতে চান তাঁরা। তাঁদের মধ্যে থেকে দুটো মুখ যেন অনেকটা উচ্ছ্বাসিত। তাঁদের চোখ দুটো বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। বেশ চেনা চেনা লাগছে তাঁদের। একটু কাছে গিয়ে দেখলো রিম্পি। তারপর ঠাম্মি দাদু বলে জড়িয়ে ধরল তাঁদেরকে। রিম্পিকে দেখে খুব আনন্দিত তাঁরাও ।
তারপর রিম্পি কিছুটা ধাতস্থ হয়ে তিয়াসাকে বলল --তাহলে তুই প্রতিবছর এখানেই আসিস দিদিয়া। ঠাম্মি বলে উঠলেন -- হ্যাঁ দিদিভাই, তিয়াসা দিদিভাই প্রত্যেক বছর তো এখানেই আসে। সকাল থেকে সারাদিন কাটায় আমাদের সাথে। আজও তো সকালে এলো। কেক আনল, আরো কত কিছু আনল আমাদের জন্য। তারপর বিকেলে বেরিয়ে গেল বলল-- একটা জিনিস আনতে ভুলে গেছি। তারপর তো দেখি তোমায় নিয়ে এলো! চোখ ভরে উঠলো জলে রিম্পির। সেই কোন ছোটবেলায় দেখেছিল সে ঠাম্মি দাদুকে। কত মজার ছিল সেই দিনগুলো। তারপর একদিন মা-বাবা তাঁদেরকে নিয়ে কোথায় যেন রেখে এলো। কতদিন পর আবার দেখল তাঁদের। এমন সময় দাদুভাই এক টুকরো কেক এনে দিল রিম্পিকে। কেকটা খেতে খেতে রিম্পি ফিরে গেল তার ছোটবেলার জীবনে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন