বাগান বিলাস - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // বাংলা ছোট গল্প // Bangla Golpo।


বাগান বিলাস

রূপবালা সিংহ রায়


 বাড়ি যাওয়ার পথে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে হঠাৎ আর্যের চোখ পড়ল এক যুগল যুবক যুবতীর দিকে । মেয়েটি বেশি উৎফুল্লতার সঙ্গে ছেলেটিকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে । আর ছেলেটি তার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে তার প্রেয়সীর প্রিয় বাগান বিলাস পাড়তে । ওই দৃশ্যটা দেখে মনের কোঠরে জমে থাকা স্মৃতিগুলো মাথা ছাড়া দিল আর্যের । বছর কুড়ি-পঁচিশ আগের কথা , এমনি করেই এক পাঁচ-সাত বছরের পুঁচকি মেয়ে মেঘা নয়-দশের আর্যকে উৎসাহ দিত তার প্রিয় ফুল বাগান বিলাস পেড়ে দেওয়ার জন্য । না দিলে হয় মুখ ফুলিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কান্না করে দিত । নয়তো আর্যের দস্যিপনার কথাগুলো দশগুণ বাড়িয়ে তার মাকে গিয়ে বলে আসতো । তাই ইচ্ছা না থাকলেও পেড়ে দিতে হতো তাকে ফুল । ফুল গুলো পেয়ে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতো । সেগুলোকে কখনো সে তার ছোট ছোট চুলে লাগানোর বৃথা চেষ্টা করতো । তো কখনো হাতে নিয়ে লাগাতো এক ছুট । ভাবতে ভাবতে কেমন শৈশবে হারিয়ে গেল আর্য । তাদের বাড়ি থেকে পাঁচ ছটা বাড়ি পরে থাকত পুঁচকে মেয়েটি । দুজনের মধ্যে ভাব থাকলেও ঝগড়া হতো প্রচুর । মাঝে মাঝে মারামারিও লেগে যেত দুজনের মধ্যে । আর্যের মা তাদের থামাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বলেই বসতেন -'না এবার দেখছি আমার সিদ্ধান্তটা পাল্টাতেই হবে ! তা না হলে তোরা তো বিয়ের পরেও এভাবে মারামারি করবি ! আর আমি পিষবো তোদের মাঝখানে '! আচ্ছা মেঘা কি জানতো ওর মা আর আমার মা মিলে ছোটবেলা থেকেই আমাদের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিল । নিশ্চয়ই জানতো ! তা নাহলে যখন চাকরিটা পাওয়ার পর কলকাতায় চলে যাচ্ছিলাম , ও কেমন ছলছল চোখে বলেছিল -'আমায় কবে নিয়ে যাবে আর্যদা' । সত্যি! সেদিন ওর কথাটা বুঝতে পারিনি আমি । কিংবা সেদিন যখন ওকে ফোনে জানিয়েছিলাম ইশার কথা । ও হ্যাঁ-হু করেও যদিও বা শুনছিল কিন্তু যখন বলেছিলাম - 'আমি ভাবছি ইশাকেই বিয়ে করবো বুঝলি ? তুই একটু বাবা মাকে বোঝা না রে ' তখন 'দেখছি' বলেই ফোনটা কেটে দিয়েছিল । তারপর থেকে ও কেমন দূরে চলে গেল । বাড়িতে গেলে আর আসতো না দেখা করতে । কিংবা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আর ফোন করত না । লাস্ট যেদিন ফোন করলো সেদিন ওর বিয়ে ছিল । বলেছিল -'আসছো তো আর্যদা'? না বলে দিয়েছিলাম । ইশার বার্থডে পার্টিতে গিয়েছিলাম । পর হয়ে গেল আমার বাগান বিলাসী মেঘা । শহুরে স্মার্ট মেয়ে ইশা আর্যের মতোই সবসময় বেটার অপশন খোঁজে , তাই সেও কদিন বাদে চলে গেল । এখন আর্য একলা । মাঝে মাঝে মনে পড়ে মেঘার কথা । ছেলেবেলায় কাটানো দিনগুলোর কথা । কেমন আছে ও কে জানে ? নিশ্চয়ই ভুলে গেছে আমায় ? আমরা মানুষেরা বড় অদ্ভুত জীব । যখন যেটা কাছে থাকে তার গুরুত্বই বুঝি না । সেটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর তা পাওয়ার জন্য ছটফট করি - ভাবতে ভাবতে পৌঁছল তাদের কাছে । পেছন থেকে এক ঝলক দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না আর্যএর যে নীল রঙের শাড়ি পরিহিত মেয়েটাই হল মেঘা । হাতে শাখা-পলা দুটো দেখে বড় অভিমান হল তার । কেন পারলি না সেদিন তুই ঝগড়া করতে ? কেন মারলি না ছোটবেলার মতো আমায় ?কেন ছোটবেলার মতো মায়ের কাছে গিয়ে আমার নামে নালিশ করলি না রে মেঘা ? তাহলে অন্তত এই ছেলেটার জায়গায় তো আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম । 

-'দাদা একটু হেল্প করবেন প্লিজ ? ফুলগুলো খুব দূরে, তাই নাগাল পাচ্ছিনা । আপনি তো দেখছি বেশ লম্বা ওই ডালটাকে একটু নিচু করবেন ? কটা ফুল নিতাম আর কি' । ছেলেটির কথা শুনে আর্য এক লাফে বাগান বিলাসের ডালটাকে ধরে কিছুটা নিচু করলো । তারপর ছেলেটি বেশ কয়েক গোছা ফুল নিয়ে ধরিয়ে দিল মেঘের হাতে । মেঘা আর্যকে ধন্যবাদ বলে বাগান বিলাস গুলোকে বুকে জড়িয়ে ধরে ছেলেটির হাত ধরে চলে গেল....



#বাগান_বিলাস

#রূপবালা_সিংহ_রায়..🖋️








সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy

মন্তব্যসমূহ