ফেরত - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // জামাইষষ্ঠীর গল্প // জামাইষষ্ঠী।
ফেরত
রূপবালা সিংহ রায়
সকাল থেকেই দত্ত বাড়িতে শুরু হয়ে গেছে রান্না বান্নার ধুম। কি নেই মেনুতে! ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা, মাছ, মাংস, ইলিশের পাতুরি, চাটনি, পাঁপড়,পায়েস, আরো কত কি! রান্না করতে করতে খুব রাগ হচ্ছে শেফালির। মাথাটা পুরো খারাপ হয়ে গেছে বুড়ো বুড়ির! তা না হলে এত রান্না কিসের জন্য? আর কেইবা খাবে এতকিছু? আর হবেই না বা কেন? অত বড় বিয়ের যোগ্য মেয়ে যখন আত্মহত্যা করে তখন কোন মা বাবারই বা মাথার ঠিক থাকে! মনু মাসির কাছ থেকে কথাটা শুনে তো প্রথমে বিশ্বাসই করে উঠতে পারেনি শেফালি। এ বাড়িতে আগে মনু মাসিই রান্নার কাজটা করত। মনু মাসি শেফালির গ্রামেই থাকে। এ বাড়ির মেয়েটা অপঘাতে মরার পর কেমন যেন ভয় ভয় করত মনু মাসির। বয়স হয়েছে তো তাই আর অত সাহসে কুলায় না। তার ওপর নিজের চোখে যখন তাকে ফ্যানের সাথে ঝুলতে দেখেছে তখন তো যে কেউই ভয় পাবে। তাই সে কাজটা দিয়ে দেয় শেফালীকে। শেফালিরও সুবিধা হয় দুটো মানুষের রান্না আর কতটুকু। তার ওপর একজন সুগারের রোগী তো অন্য জন জন প্রেসারের। এই খায়না ঐ খায় না, তাই রান্নার ঝক্যিটাও কম। সেই জন্য সেদিন কথা দিয়ে এসেছিল অন্য বাড়িটাতে তাড়াতাড়ি যাবে। তাদের বাড়ি আবার জামাই ষষ্ঠী আছে, মেয়ে জামাই আসবে। ভেবেছিল এ বাড়িতে রান্নাটা ঝটপট সেরে ওবাড়িতে রওনা দেবে। তার হলো কোথায়, সেই আটকে পড়লো। এদিকে মুখের উপর কিছু বলতেও পারছে না। দত্ত কাকিমা একটার পর একটা পদ বাড়িয়েই যাচ্ছে। আর দত্ত কাকু ছুটছে বাজারে তা আনার জন্য। এই করে করে বেশ খানিকটা দেরীও হয়ে গেল তার। অবশেষে রান্না শেষ করে কাকিমাকে বলতে গেলে কাকিমা বলল -- যাচ্ছিস যা তবে তাড়াতাড়ি ফিরিস কিন্তু। এবার রাগ হলো তার এই কাকিমার এক দোষ সবসময় এমন করে। রান্না শেষ করে ওভেন সমেত রান্নাঘরটা মুছে পরিষ্কার করে বেরোনোর পর তার অন্য আর একটা পদ রান্না করার কথা মনে পড়ে। নির্ঘাত এই বেলাও সেটাই করবে। সেই জন্যই বোধহয় কাকুকে বাইরে পাঠিয়েছে কিছু একটা আনাতে! আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে। রাগ করে দুটো কথা বলতে যাবে এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল। কাকিমা দরজাটা খুলতে বললে, রাগে গজগজ করতে করতে গিয়ে দরজাটা খুলে দেখে কাকু দাঁড়িয়ে হাতে একটা ব্যাগ। এবার সটান সে বলেই দিল -- আমি কিন্তু আর কিছু রান্না করতে পারবো না। আমি চললাম.... মুখ থেকে কথাটা শেষ হতে না হতেই সে দেখল তার স্বামী দাঁড়িয়ে কাকুর পেছনে সঙ্গে ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে! থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। এরা এখানে কেন?-- ভেবে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করতে যাবে এমন সময় কাকু বলল -- আমি ডেকেছি। আজ জামাইষষ্ঠী কথাটা কি ভুলে গেলি? মনে পড়ে শেফালির সেই জন্যই বোধহয় সেদিন কাকু জিজ্ঞাসা করেছিল -- কিরে জামাইষষ্ঠীর দিন কাজে আসবি তো নাকি জামাই ষষ্ঠী করতে যাবি মা বাবার কাছে। শেফালী জানিয়েছিল -- বাবা মরার পর মা যদিও করতো কিন্তু বছর তিনেক আগে মা মারা যাওয়ায় সে পাট চুকে গেছে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে। দাদারা আর ডাকে না। তাই বুঝি কাকু ডেকে এনেছে তার বরকে কিন্তু কেমন যেন মনটা খুঁতখুঁত করছে তার যতই হোক... তাই কাকুকে বলল -- এসবের কি দরকার ছিল কাকু?
-- কেন দরকার নেই বল? তাহলে সেদিন যখন তোর কাকিমা মেয়ের কথা মনে করে কান্না করছিল তুই বলেছিলিস কেঁদো না কাকিমা যে গেছে তার কথা ভেবে মিছিমিছি কষ্ট পেয়ো না। তোমার কিছু হয়ে গেলে কাকুর কি হবে? তোর কাকিমা যখন বলল -- আর বেঁচে কি করবো বল তো, মা ডাক তো আর শুনতে পাবো না। তখন বলেছিলিস -- আজ থেকে আমি তোমার মেয়ে হলাম। আজ থেকে তোমায় আমি মা বলে ডাকবো। তাই করলি, মা বলেই ডাকলি কাকিমাকে। আর কাকুকে কাকুই রাখলি। চোখ দুটো ভিজে গেল শেফালির। তা মুছতে মুছতে বাবা বলে দত্ত কাকুর পা দুটোকে স্পর্শ করল।
-- থাক থাক বেঁচে থাক বলে ছল ছল চোখে তার মাথায় হাত রাখলেন দত্ত বাবু।
#ফেরত
#রূপবালা_সিংহ_রায়....🖋️©️
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন